রিয়াজুল হক সাগর, রংপুর
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত এক স্কুলশিক্ষক, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের দাবি জানিয়েছে মানববন্ধন সমাবেশ করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন। এসময় কর্মসূচি থেকে পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বক্তব্যে অমিল থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের আহ্বান জানান সংগঠনটির নেতাদের।
বুধবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে রংপুর প্রেসক্লাব চত্বরে রংপুর জেলা ও মহানগর সুজন এ সমাবেশের আয়োজন করে। এতে সুজনের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ এতে অংশ নেন। এ সময় বক্তারা পুলিশের তদন্তে নানা অসংগতি তুলে ধরে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও হুকুমদাতাদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান।
সুজন রংপুর জেলা সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রংপুরে থানা ও পুলিশের বিভিন্ন উইং বাড়লেও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা কাটেনি। জনগণের সঙ্গে কাঙ্ক্ষিত সেতুবন্ধন তৈরি হয়নি। রাষ্ট্র ও নাগরিক পুলিশের কাছ থেকে সেবা ও নিরাপত্তা চায়।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, এক-দু’জন মাদকাসক্ত যুবক চার চারটি মানুষকে এভাবে হত্যা করতে পারে না। শুধুমাত্র ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার কারণে এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে একটি পরিবারকে নিঃশেষ করে দেয়ার দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃত ঘটনা বা কারণ আড়াল হতে পারে, এই ধারণাও উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। তাই কোনো অজুহাত দিয়ে প্রকৃত অপরাধী, পরিকল্পনাকারী ও হুকুমদাতাদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
সুজনের এই সংগঠক ঘটনাটিতে পুলিশের আইজিপি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। একই সাথে তিনি স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তদন্তের গাফিলতি তুলে ধরে মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট জোবায়দুল ইসলাম বুলেট বলেন, আসামিদের আরও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তাদের নেপথ্যে কোনো চক্রান্ত রয়েছে কি না তা বের করা হয়নি। আসামিদের ডোপ টেস্ট করা হয়নি এবং যে ব্যক্তি আগাম তথ্য দিয়েছিল, সে কীভাবে জানল তা-ও খতিয়ে দেখা হয়নি। ঘটনার সময় বিদ্যুতের সংযোগকে বিচ্ছিন্ন করল তাও তদন্তের দাবি রাখে। এ ঘটনায় পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ের পর জনমনে যেসব প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে তার উত্তর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বের করাই দায়িত্বশীল পুলিশিং হতে পারে। কিন্তু আমরা সেটি এখনো দেখতে পাচ্ছি না।
দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে উল্লেখ করে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি বলেন, দুর্বল তদন্তের কারণে আসামিরা ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে ওই এলাকার মাদক ব্যবসায়ীরা আত্মগোপনে চলে গেছে। পুলিশ তাদের এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এসময় নগরীর প্রতিটি এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম আরো জোরদার করার তিনি দাবি জানান।
সুজনের উপদেষ্টা সদস্য ও নারীনেত্রী মঞ্জুশ্রী সাহা মিডিয়ায় উঠে আসা ধর্ষণের আলামত নিয়ে মর্গের ডোম ও ময়নাতদন্তের ফরেনসিক চিকিৎসকের বক্তব্যের গরমিল এবং ধর্ষণ প্রসঙ্গে প্রশাসনের এড়িয়ে যাবার প্রবণতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, নিহত তরুণীর সঙ্গে তার বান্ধবীর কথোপকথনে হত্যার হুমকি ও জিডি করার বিষয় এবং ঘটনার দিন ভোরে বিদ্যুৎ না থাকা নিয়ে বান্ধবীর সাথে চ্যাটিং করার প্রসঙ্গটি পুলিশের ভালো ভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ও আশপাশের সিসিটিভি নষ্ট থাকার মধ্যেও রহস্য রয়েছে, এসব কারণে মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। মানুষ মনে করছে এ ঘটনাটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। ঘটনার পরে থেকে মানুষ ঘরে-বাইরে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
একই সময়ে এ দাবির সাথে সংহতি জানিয়ে মানববন্ধনে অংশ নেয় ফোর্ব জেলা ফোরাম ও ইয়ুথ এন্ডিং হাঙ্গারের নেতৃবৃন্দ, সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবীগণ। তারা বক্তব্যে
রংপুর নগরীর সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানান।
এ মানববন্ধন সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সুজন রংপুর মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন স্বাধীন, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহে আলম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন, প্রচার সম্পাদক ফরহাদুজ্জামান ফারুক, ফোর্ব জেলা ফোরামের সদস্য জাকিয়া সুলতানা মলি, আফরোজা রাধন, ভারতী রানী, ইয়ুথ লিডার রাকিবুল ইসলাম, লাবিব প্রমুখ।
প্রসঙ্গত; গত শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে রংপুর নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার নিজ বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় রোববার ভোরে একই এলাকা থেকে কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯) আটক করা হয়। ওই দিন বিকেলে নিহত চারজনের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য হয়।
রোববার বিকেলে নিহতের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ওইদিন রাতে আসামিরা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে তাদের দুজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।
বর্তমানে আলোচিত এ মামলাটির তদন্তভার কোতয়ালী থানা থেকে বদল করে গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) দেওয়া হয়েছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ওসি জিনাত আলী এ মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা।
বাণিজ্যিক
কার্যালয় : ৭৮/ই, পুরানা
পল্টন লেন বিজয় নগর,
ঢাকা-১০০০।
মোবাইল,ই-মেইল:
banglamatirnews@gmail.com