মেহেদী হাসান (অন্তর), নওগাঁ:
কষ্টের উপার্জনে বাজার থেকে যে চাল কিনে ঘরে ফিরছেন সাধারণ মানুষ, তার প্রকৃত জাত ও উৎপাদন খরচ নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। মাঠপর্যায়ে কৃষিবিজ্ঞানীদের স্পষ্ট তথ্য-দেশে বহুল আলোচিত তথাকথিত ‘মিনিকেট’ নামে কোনো ধানের জাতই নেই, অন্যদিকে ‘পায়জাম’ জাতের ধানের আবাদও বন্ধ হয়েছে বহু আগে। অথচ বাজারজুড়ে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে এই দুই জাতের চাল। মূলত কম দামি চাল অটো রাইস মিলে ছাঁটাই, পলিশ ও বস্তার নাম পরিবর্তন করেই সাধারণ ভোক্তার পকেট কাটছে এক শ্রেণির অসাধু মিলার ও পাইকারি সিন্ডিকেট।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন তথাকথিত ‘মিনিকেট’ চাল মূলত তৈরি হচ্ছে জিরা ও কাটারি ধান থেকে। অটো রাইস মিলে অতিরিক্ত ছাঁটাই ও পলিশের মাধ্যমে চাল চকচকে করে আকর্ষণীয় প্যাকেটে ‘মিনিকেট’ নাম দেওয়া হচ্ছে। যেখানে বাজারে ৫০ কেজির এক বস্তা জিরা বা কাটারি চাল ৩৬০০ থেকে ৩৮০০ টাকায় বিক্রি হয়, সেখানে একই চাল মিনিকেট নাম ধারণ করলেই দাম দাঁড়ায় ৪২০০ থেকে ৪৬০০ টাকা পর্যন্ত। মিলার পর্যায়ে ৫০ কেজির বস্তাপ্রতি উৎপাদন খরচ প্রায় ৩১০০ টাকা হলেও মিলাররা তা বিক্রি করছেন ৩৫০০ থেকে ৩৮০০ টাকায়। এরপর পাইকারিতে ৩৯০০ থেকে ৪০০০ এবং হাতবদল হয়ে খুচরা বাজারে তা গিয়ে ঠেকছে ৪২০০ থেকে ৪৪০০ টাকায়। অর্থাৎ, কেবল ছাঁটাই ও মোড়ক পরিবর্তনের কারণে বস্তাপ্রতি ভোক্তার পকেট থেকে খসছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা অতিরিক্ত।
একই কৌশলে চলছে পায়জাম চালের জালিয়াতি। জেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে পায়জাম ধানের চাষ দেশে প্রায় বন্ধ থাকলেও বাজারে কম দামি ‘স্বর্ণা-৫’ চালকে প্রক্রিয়াজাত করে পায়জাম হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে।
এ দিকে খোলা বাজারে ২৫ কেজির এক বস্তা স্বর্ণা-৫ চালের দাম ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা, অথচ সেটি পায়জাম নাম দিয়ে বিক্রি হচ্ছে ১৪৫০ থেকে ১৬০০ টাকায়। নওগাঁর মোকামগুলো থেকে ১৫ টনের এক ট্রাক চাল পায়জাম নামে রাজধানীতে পাঠানো হলে শুধুমাত্র নাম বদলে বাড়তি মুনাফা উঠছে প্রায় ৯০ হাজার টাকা থেকে ১ লক্ষ ১০হাজার পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে ক্রেতার কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে অন্তত ৬থেকে ৮ টাকারও বেশি।
প্রতারণার জাল বিস্তার করেছে সুগন্ধি চালের বাজারেও। অভিযোগ রয়েছে, ব্রি-ধান ৯০-এর সাথে কৃত্রিম সুগন্ধি পাউডার বা সেন্ট মিশিয়ে এবং ব্রি-৩৪ জাতের চাল কিংবা জিরা চাল মিক্সিং করে তা পোলাও ও আতপ চাল হিসেবে বাজারে ছাড়া হচ্ছে। সাধারণ মানের এই মিশ্রিত চাল খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৪০ টাকা দরে।
জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, একসময় পায়জাম ধানের চাল বাজারে বিক্রি হতো। বর্তমানে সেই চালের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে স্বর্ণা-৫ চালকে পায়জাম নামে বিক্রি করা হচ্ছে। একইভাবে, বাজারে চাহিদা থাকায় জিরা চাল মিনিকেট নামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে একই চাল বিভিন্ন নামে বাজারজাত করা হচ্ছে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো: ফরহাদ খন্দকার জানান, স্বর্ণা পাচঁ ও পায়জাম চালের পার্থক্য নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভোক্তারা। ব্র্যান্ডের ওপর ভরসা করে চাল কিনলেও সুযোগ নিচ্ছেন কিছু উৎপাদক। অনিয়মে জড়িত মিলারদের চিহ্নিত করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে চিঠি দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এছাড়াও তিনি আরোও জানান ছোট মিলারদের ট্রেডমার্ক নিবন্ধনের আওতায় আনার বিষয়টিও গুরুত্ব দিচ্ছেন দ্রুত চিঠি পাঠানো হবে সকল মিলারকে।
সচেতন মহলের অভিযোগ, মিল থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত হাতবদলের নামে চালের দাম বৃদ্ধি এবং প্যাকেট বদল করে জাত পরিবর্তনের এই মহোৎসব চললেও কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অটো রাইস মিল ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর অসহায়ত্ব সাধারণ ভোক্তাকে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অবিলম্বে চালের জাতভিত্তিক সঠিক লেবেলিং নিশ্চিত এবং মিল পর্যায়ে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন ভোক্তারা।
মেহেদী হাসান (অন্তর)জেলা প্রতিনিধি নওগাঁ। তারিখ:১৩.১০.২৬ 01742-162355
বাণিজ্যিক
কার্যালয় : ৭৮/ই, পুরানা
পল্টন লেন বিজয় নগর,
ঢাকা-১০০০।
মোবাইল,ই-মেইল:
banglamatirnews@gmail.com