মাহাবুব আলম তুষার,মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলা থানার অস্ত্রাগার থেকে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ সরকারি একটি ৯ এমএম পিস্তল ও একটি ম্যাগাজিন নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় থানার অস্ত্রাগারের দায়িত্ব, সরকারি মালামাল হস্তান্তর প্রক্রিয়া এবং সাবেক ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সাংবাদিক এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, হরিরামপুর থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনাম মোহাম্মদ আফজাল হোসেন ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বুধবার অন্য থানায় বদলি হন। এরপর হরিরামপুর থানায় নতুন ওসি জে. এম. তোফিক আজম যোগদান করেন।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী দায়িত্বভার হস্তান্তরের জন্য চার্জ রিপোর্টে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর থাকার কথা। তবে অভিযোগ উঠেছে, দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় থানার সব সরকারি মালামাল সরেজমিনে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। অস্ত্র, গোলাবারুদ, ওয়াকিটকি, হিসাবের খাতাপত্র, মামলার নথি, জব্দ করা আলামত এবং অন্যান্য সরকারি সরঞ্জাম যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বর্তমান ওসি জানান, কাগজপত্রে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও তাঁকে সব সরকারি মালামাল বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। মালামাল বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলে সময়ক্ষেপণ করা হয় এবং একপর্যায়ে সাবেক ওসি চলে যান বলে তাঁর অভিযোগ।
অস্ত্র নিখোঁজের বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান ওসি বলেন, অস্ত্রাগারের দায়িত্বে ছিলেন সাব-ইন্সপেক্টর এমদাদ হোসেন। বিশেষ ডিউটিতে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে একটি অস্ত্র নিয়ে গিয়েছিলেন সাব-ইন্সপেক্টর বাসার। তিনি অস্ত্রটি সাব-ইন্সপেক্টর জয়নালকে বুঝিয়ে দেন এবং জয়নাল তা কনস্টেবল হারুনকে বুঝিয়ে দেন বলে খাতায় অস্ত্র হস্তান্তরের তথ্য রয়েছে।
বর্তমান ওসির ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নিজে অস্ত্রগুলো গণনা করতে গিয়ে একটি ৯ এমএম পিস্তল খুঁজে পাননি। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন এবং সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। এ ছাড়া দাপ্তরিকভাবে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
বর্তমান ওসি আরও বলেন, তিনি যদি মালখানার সব মালামাল যাচাই না করতেন, তাহলে বিষয়টি অজানা থেকে যেত। পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব গ্রহণকারী কর্মকর্তাও সমস্যায় পড়তে পারতেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সহকর্মীকে অবহিত করা হলেও তিনি অভিযোগটি অস্বীকার করছেন বলে জানান বর্তমান ওসি।
অস্ত্রাগারের দায়িত্বে থাকা সাব-ইন্সপেক্টর এমদাদ হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, কাগজপত্রে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হলেও প্রতিটি সরকারি মালামাল সরেজমিনে যাচাই করে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।
এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে দায়িত্ব হস্তান্তরের কাগজপত্র, অস্ত্রাগারের রেজিস্টার এবং অস্ত্র গ্রহণ ও জমা দেওয়ার নথি যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হরিরামপুর থানার সাবেক ওসি এনাম মোহাম্মদ আফজাল হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, থানার সব মালামাল বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের চার্জ রিপোর্টের কপি তাঁর কাছে রয়েছে।
মালামাল সরেজমিনে বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মালামাল বুঝিয়ে না দিলে বর্তমান কর্মকর্তা দায়িত্ব হস্তান্তরের কাগজে স্বাক্ষর করতেন কেন?
সাবেক ওসির বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান ওসি ও অস্ত্রাগারের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার বক্তব্যের পার্থক্য থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, তা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
থানার অস্ত্রাগারে সংরক্ষিত সরকারি অস্ত্র ও গোলাবারুদের হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ, নিয়মিত গণনা এবং পরিদর্শনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অস্ত্রাগারের রেজিস্টার, অস্ত্র ইস্যু ও জমার নথি এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের কাগজপত্র পর্যালোচনা করে পিস্তলটি সর্বশেষ কার হেফাজতে ছিল, কখন অস্ত্রের ঘাটতি দেখা দেয় এবং বিষয়টি আগে শনাক্ত হয়েছিল কি না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সাবেক ওসির দায়িত্ব পালনকালে নির্ধারিত নিয়মে অস্ত্রাগার পরিদর্শন ও অস্ত্র গণনার নথি সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, সাবেক ওসি দায়িত্বে থাকাকালে হরিরামপুর থানায় আরও কিছু অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের দাবি, একবার হাতকড়া পরা অবস্থায় একজন আসামি পুলিশের কাছ থেকে পালিয়ে যান। এ ছাড়া থানায় জব্দ থাকা একটি মোটরসাইকেল পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে অন্যত্র বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে। পরে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি গোপনে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সাবেক ওসির দায়িত্ব পালনকালে জননিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। তাঁরা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
থানার অস্ত্রাগার থেকে সরকারি আগ্নেয়াস্ত্র নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, সরকারি অস্ত্রের হিসাব ও হেফাজত নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। ফলে অস্ত্রটি কীভাবে নিখোঁজ হলো, দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় কী কী নথি প্রস্তুত করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার কী দায়িত্ব ছিল এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুন না কেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাঁদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নিখোঁজ সরকারি পিস্তল ও ম্যাগাজিন উদ্ধার এবং থানার অস্ত্রাগারের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বাণিজ্যিক
কার্যালয় : ৭৮/ই, পুরানা
পল্টন লেন বিজয় নগর,
ঢাকা-১০০০।
মোবাইল,ই-মেইল:
banglamatirnews@gmail.com