
মাহাবুব আলম তুষার,মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে থাকলেও মানিকগঞ্জে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, গোপনে বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি গঠনের প্রস্তুতি চলছে। উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে এসব কার্যক্রম প্রকাশ্যে না করে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পরিচালনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তৃণমূল নেতাকর্মীদের।
অভিযোগ রয়েছে, মানিকগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো:আবুল বাশারের আস্থাভাজন এবং টুটুল চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রাতুল আলমগীরকে ঘিওর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে বসানোর প্রচেষ্টা চলছে। এ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ঘিওর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্ভাব্য নেতৃত্বের আলোচনায় চারজনের নাম উঠে এসেছে। তাঁরা হলেন রাতুল আলমগীর, আমিনুর বেপারী, রওশন ইমতিয়াজ সুমন ও মুস্তাফিজুর রহমান রনি। স্থানীয় পর্যায়ে তাঁদের পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও আলোচনা চলছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, চারজনের মধ্যে দুজনের পরিবারের বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে এবং অন্য দুজন আওয়ামী লীগপন্থি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাতুল আলমগীর ও রওশন ইমতিয়াজ সুমনের পরিবারের বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
রওশন ইমতিয়াজ সুমনের আপন ভাই নওশাদ সুজন ঘিওর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং বর্তমান কমিটির সহসভাপতি বলে জানা গেছে। অন্যদিকে রাতুল আলমগীরের পরিবারের সদস্যদেরও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে।
রওশন ইমতিয়াজ সুমনের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের আমলে মাদকসহ প্রশাসনের হাতে আটক হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট মামলায় কারাভোগের অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে রাতুল আলমগীরের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, টুটুল চেয়ারম্যানের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে টুটুল চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক বলয় সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে তাঁকে আওয়ামী লীগের ব্যানারে পদধারী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তাঁর ছাত্রলীগের রাজনীতিতে পূর্ববর্তী কোনো সাংগঠনিক পদ-পদবির তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
অন্যদিকে রওশন ইমতিয়াজ সুমন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সুসময়ে সাবেক সংসদ সদস্য নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদ পেয়েছিলেন বলে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তেমন সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল না। তাঁর বাবাও ইউনিয়ন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
অপর দুই সম্ভাব্য প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমান রনি ও আমিনুর বেপারীর পরিবারের আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। তাঁদের বাবা ও চাচারা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং দলীয় পদ-পদবি ধারণ করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
এদিকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মো:আবুল বাশারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ব্যাপক ক্ষতি হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা একে অপরের ভালো দেখতে পারি না। গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের নেতাদের পরিবারের অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের অনেক নেতার পরিবার বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করার যে প্রবণতা দেখা গেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই ধরনের অভিযোগ সামনে আসছে। রাজনৈতিক সংগঠনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও তৃণমূলের মূল্যায়ন নিশ্চিত না হলে সাংগঠনিক সংকট আরও বাড়তে পারে।
তাঁদের মতে, ব্যক্তিগত পছন্দ, পারিবারিক পরিচয় কিংবা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নেতৃত্ব নির্ধারণের অভিযোগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো ও ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, যোগ্যতা, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।