
মোঃ রাজু মিয়া, বিশেষ প্রতিনিধিঃ
দেবী চৌধুরাণী ছিলেন একজন নারী ব্রিটিশবিরোধী নেত্রী ও পীরগাছার জমিদার। তিনি ব্যান্ডিট কুইন বা দস্যুরাণী নামেও পরিচিত।
দেবী চৌধুরানী বাংলাদেশের রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। তার জন্ম নাম ছিল জয়দুর্গা দেবী। তার বাবার নাম ছিলো ব্রজ কিশোর চৌধুরী এবং মাতার নাম কাশীশ্বরী দেবী।
মন্থনা তথা পীরগাছার জমিদার নারায়ণ চন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে তার বিয়ে হয় এবং সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সময় তিনি সেই এলাকার জমিদার ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর নিঃসন্তান জয়দুর্গা ১৭৬৫-১৮০১ পর্যন্ত মন্থনা এস্টেটের দায়িত্ব সামলেছিলেন।
তার সময় রংপুর অঞ্চলের কালেক্টর হয়ে আসেন জনাথন গুডল্যাড এবং তার দেওয়ান নিযুক্ত হন দেবীসিংহ। দেওয়ান দেবীসিংহ ও তার কর্মচারী হরে রামের উপর রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব প্রদান করেন। রাজস্ব আদায়ে সময় তাদের অত্যাচারে কৃষক এমনকি জমিদাররাও অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এছাড়াও সেই সময় ইংরেজ নীলকরদের অত্যাচার বেড়ে যায়,তারা জোরপূর্বক উর্বর জমিতে কৃষকদের নীলচাষ করতে বাধ্য করা শুরু করে।তারই পরিপ্রেক্ষিতে দেবী চৌধুরাণী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আর তার কারণে তিনি ব্রিটিশদের রোষানলে পড়ে। তাকে দমন করার জন্য মীর কাশিমের নেতৃত্বে একদল ইংরেজ সৈন্যবাহিনী পাঠায়।
এ যুদ্ধে দেবী চৌধুরানীর সাথে রংপুরের নূর উদ্দিন বাকের মুহাম্মদ জং,ভবানী পাঠক এবং দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়া অঞ্চের শত শত কৃষক অংশ নেয়।১৭৬০ সালে ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে দেবী চৌধুরাণী জয়লাভ করে। যুদ্ধে ইংরেজ ক্যাপ্টেনসহ অনেকে নিহত হন এবং মীর কাশিম পিছু হটতে বাধ্য হন।দেবী চৌধুরাণীর যুদ্ধে জয়লাভের স্থানটি এখনও মানুষের কাছে “জয়পুর” নামে পরিচিত।
তাঁর নামে রংপুরে দেবী চৌধুরাণী ডিগ্রী কলেজ, চৌধুরাণী রেলস্টেশন, চৌধুরাণী উচ্চ বিদ্যালয়, চৌধুরাণী বাজার রয়েছে। তাঁর খননকৃত বিশাল চৌধুরাণী দিঘি, চন্ডিপুর দিঘি এবং মন্থনার রাজবাড়ি আজো টিকে আছে কালের সাক্ষী বহন করে। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার পারুল ইউনিয়ন পার হলে চন্ডীপুর বাজারে নাপাই চন্ডীর বৈশাখি মেলা হয়। এই স্থানটিতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুদ্ধ করেন দেবী চৌধুরানী। দেবী চৌধুরানী ক্ষণজন্মা এক জনহিতৈষী নারী ও তেজস্বী বিপ্লবী।
সব প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে দুঃখ-কষ্ট জয় করে একসময় ইংরেজ ও জমিদারদের শাসন-শোষণের শিকার নিরীহ মানুষদের নয়নের মণি হয়ে ওঠেন ‘দেবী চৌধুরানী’।
সেসব ঐতিহাসিক ঘটনা ১৮৮৪ সালে লেখনির মাধ্যমে ফুটে তুলেছেন লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮৪ সালেই।
১৭৮৩ সালে এপ্রিল মাসে পহেলা বৃহস্পতিবার (বর্তমান পীরগাছা উপজেলার চন্ডিপুর গ্রাম) লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস এর নেতৃত্বে একদল ইংরেজ বাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের সাথে যুদ্ধ করে পরাজিত এবং নিহত হন।এই যুদ্ধে দেবী চৌধুরাণীর সাথে অন্নদানগরের জমিদারও নিহত হন।দেবী চৌধুরাণীর পরাজিত স্থানে বাংলা বৈশাখ মাসের প্রতি বৃহস্পতিবার মেলা বসে। যা “নাপাইচন্ডি” মেলা নামে পরিচিত।