
স্টাফ রিপোর্টার
গ্রাহকের হাতে ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার রসিদ আছে।কিন্তু ব্যাংক হিসাবে সেই টাকার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। টাকা তুলতে গিয়ে একের পর এক গ্রাহক জানতে পারছেন, তাঁদের হিসাবে জমা হয়নি টাকা।কয়েকজন গ্রাহকের দেওয়া হিসাবমতে ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা জমা না হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এমন অভিযোগ করেছেন অগ্রণী ব্যাংকের মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর শাখার গ্রাহকেরা।আর এই কারসাজির অভিযোগ উঠেছে ওই শাখার অফিসার (ক্যাশ) শরিফুজ্জামান সোহাগের বিরুদ্ধে। তিন দিন ধরে তিনি ব্যাংকে অনুপস্থিত রয়েছেন।তাঁর মোবাইলও বন্ধ।
শরিফুজ্জামানের অনুপস্থিতি এবং গ্রাহকদের হিসাবে টাকা না থাকার বিষয়টি জানাজানি হলে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরের পর ব্যাংকের বাইরে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের ভিড় বাড়তে থাকে। অনেকে তাঁদের কাছে থাকা টাকা জমার রসিদ নিয়ে ব্যাংকে এসে হিসাব যাচাই করেন।একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় বিকেলে শ্রীনগর উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তারা ব্যাংক পরিদর্শনে যান।
গ্রাহকেরা ব্যাংকে অবস্থান নেওয়ায় কোনো বিশৃঙ্খলা যাতে তৈরি না হয়,সে জন্য সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান শ্রীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: জুয়েল মিয়া।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী,কয়েকজনের হিসাবে প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা জমা না হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।তাঁদের দাবি,একইভাবে আরও অন্তত শতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে।ফলে অভিযোগের মোট অর্থের পরিমাণ আরও বড় হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।তবে ঠিক কতজন গ্রাহকের টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা হয়নি এবং অর্থের পরিমাণ কত,তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ব্যাংক সূত্রে জানা যায়,শরিফুজ্জামান পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ওই শাখায় কর্মরত।টাকা জমা দেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় গ্রাহকদের টাকা তুলতে সহযোগিতা করার কারণে গ্রাহকদের সঙ্গে তাঁর একধরনের পরিচিতি তৈরি হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় কয়েকজন বলেন,সম্প্রতি শরিফুজ্জামান তাঁর পরিচিত গ্রাহকদের জানান,তাঁর মাধ্যমে এফডিআর (স্থায়ী আমনত) করলে ১১ শতাংশ হারে মুনাফা পাওয়া যাবে।এরপর কয়েকজন গ্রাহক তাঁর মাধ্যমে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে শুরু করেন। টাকা জমা নেওয়ার পর তাঁদের হাতে রসিদও দেওয়া হতো।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় বিকেলে শ্রীনগর উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তারা ব্যাংক পরিদর্শনে যানছবি: প্রথম আলো
গত বুধবার শরিফুজ্জামানের মাধ্যমে টাকা জমা দেওয়া এক গ্রাহক ব্যাংকে এসে তাঁর হিসাবের টাকা জানতে চান।তখন তিনি জানতে পারেন,তাঁর হিসাবে ওই টাকা জমা হয়নি।আজ আরও কয়েকজন গ্রাহক ব্যাংকে এসে একই ধরনের তথ্য পান বলে দাবি করেন।এরপর তাঁরা জানতে পারেন,তিন দিন ধরে শরিফুজ্জামান ব্যাংকে অনুপস্থিত রয়েছেন।
বেজগাঁও এলাকার জুথি আক্তার বলেন,প্রায় এক সপ্তাহ আগে তিনি সাত লাখ টাকা জমা দেন।টাকা তোলার জন্য বৃহস্পতিবার ব্যাংকে এসে জানতে পারেন,তাঁর হিসাবে ওই টাকা জমা হয়নি।
শরিফুজ্জামানের মাধ্যমে ব্যাংকে সাত লাখ টাকা জমা দিয়েছিলেন বলে জানান বারিগাঁও এলাকার জাকিয়া সুলতানাও।এ জন্য তাঁকে একটি জমা রসিদও দেওয়া হয়। পরে হিসাব যাচাই করে দেখেন,তাঁর হিসাবে ওই টাকা নেই।
শ্রীনগর উপজেলার আড়িয়লপাড়ার নাছির হাওলাদার বলেন, তিনি ১৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছিলেন।পরে হিসাব যাচাই করে ওই টাকার কোনো অস্তিত্ব পাননি।আরেক ভুক্তভোগী নুরুল ইসলাম বলেন, আমার তাঁর স্ত্রী রোজিনা বেগমের ২৭ লাখ টাকা এবং স্ত্রীর বড় ভাইয়ের ৮১ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছিল।পরে ব্যাংকে এসে তাঁরা দেখতে পান,সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলোতে ওই টাকা নেই।
এই কয়েকজন গ্রাহকের দাবি অনুযায়ী,তাঁদের হিসাবে মোট ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা জমা হয়নি।এর বাইরে আরও অনেক গ্রাহক একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে ব্যাংকে আসছেন বলে দাবি তাঁদের।
শ্রীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাছিবুর রহমান বলেন,অভিযোগের বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে।অভিযোগের খবর পেয়ে শতাধিক গ্রাহক ব্যাংকে জড়ো হয়েছেন। গ্রাহকদের হাতে থাকা রসিদ,ব্যাংকের হিসাব ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা হচ্ছে।অনেকের হিসাব ঠিকঠাক পাওয়া যাচ্ছে। যাঁদের হিসাবের সঙ্গে রসিদের মিল পাওয়া যাচ্ছে না,তাঁদের নথি রাখা হচ্ছে।বিষয়টি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত ঘটনা ও অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে অভিযুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তা শরিফুজ্জামানের মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে নম্বরটি সঠিক নয় বলে ফোনের স্বয়ংক্রিয় সেবা থেকে জানানো হয়।অগ্রণী ব্যাংকের শ্রীনগর শাখার ব্যবস্থাপক মো:শরিফুদ্দিনের মুঠোফোনেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।
অগ্রণী ব্যাংকের মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলের প্রধান ও ব্যাংকটির উপমহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান বলেন,‘শরিফুজ্জামানের বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে অডিট টিম এসে বিষয়টি তদন্ত করবে।তদন্তে এ ঘটনায় অন্য কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।