
মোঃ রাজু মিঞা বিশেষ প্রতিনিধি:
২ অক্টোবর সন্ধ্যায় চুপিসারে গিয়েছিলাম ইটাকুমারীর তারুণ্যের সৃষ্টি সেই চায়ের আড্ডা দেখতে। কাছে না গিয়েও দূর থেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখি, এ যেন শুধু চায়ের আড্ডা নয়—অসংখ্য তরুণ,আাদিবাসী জনগোষ্ঠী ও সর্বসাধারণের মিলনমেলা। চারদিকে তারুণ্যের প্রাণচাঞ্চল্য। কেউ চা পান করছেন, কেউ গল্প করছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউবা পুরোনো জমিদারবাড়ির দিকে তাকিয়ে ইতিহাসের কথা ভাবছেন। রাতের ইটাকুমারী শিবচন্দ্র রায় জমিদারবাড়ি নানারঙের আলোকসজ্জায় যেন নতুন রূপ পেয়েছে।
কিছুদিন আগেও এই জায়গাটির চেহারা ছিল একেবারেই অন্য রকম। জমিদারবাড়ির চারপাশে আবর্জনার স্তূপ, আগাছার জঙ্গল, ময়লা-দুর্গন্ধে পরিবেশ ছিল অসহনীয়। ইতিহাসের এমন একটি মূল্যবান স্থাপনা যেন মানুষের চোখের সামনেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল। ভাঙা দেয়াল আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইটের সঙ্গে মিশে ছিল অবহেলার চিহ্ন।
সেই জায়গাতেই কয়েকজন তরুণ উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। নিজেরাই পরিষ্কার করেছেন আবর্জনা, কেটেছেন আগাছা, দুর্গন্ধময় পরিবেশকে যতটা সম্ভব পরিচ্ছন্ন করেছেন। তৈরি করেছেন বসার জায়গা। সাজিয়েছেন চারপাশ। আর সেখানে গড়ে তুলেছেন চায়ের আড্ডা। ছোট্ট একটি উদ্যোগ কীভাবে একটি বিস্মৃত স্থানকে মানুষের মিলনস্থলে পরিণত করতে পারে, ইটাকুমারী তারই একটি জীবন্ত উদাহরণ।
তাঁদের হাতে নেই বড় কোনো বাজেট, নেই সরকারি প্রকল্পের বিশাল আয়োজন। আছে শুধু ইচ্ছা, শ্রম আর সৌন্দর্যবোধ। তাঁরা যেন বুঝিয়ে দিয়েছেন—কোনো জায়গাকে ভালোবাসতে হলে সবসময় বড় অর্থের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন উদ্যোগের।
পীরগাছার আনাচে-কানাচে তরুণদের এমন চায়ের আড্ডা এখন চোখে পড়ে। গ্রামের রাস্তার মোড়ে, সবুজ প্রকৃতির পাশে, বিলের ধারে কিংবা কোনো ঐতিহ্যের ছায়ায় গড়ে উঠছে নান্দনিক চায়ের টং। বাঁশ-কাঠের ছোট্ট ঘর, পরিচ্ছন্ন বসার জায়গা, মৃদু আলো আর রকমারি চায়ের আয়োজন। চায়ের দোকান যেন আর শুধু চা বিক্রির জায়গা নয়; হয়ে উঠছে তরুণদের নির্মল আড্ডা, সৃজনশীলতা ও স্বাবলম্বিতার নতুন ঠিকানা।
ইটাকুমারীর উদ্যোগটির বিশেষত্ব এখানেই—তরুণেরা শুধু নিজেদের জন্য একটি আড্ডার জায়গা তৈরি করেননি, তাঁরা একটি ঐতিহাসিক স্থানকে মানুষের সামনে আবারও তুলে ধরেছেন।
ইটাকুমারী শিবচন্দ্র রায় জমিদারবাড়ি আমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন। একসময় ‘দ্বিতীয় নবদ্বীপ’ নামে পরিচিত এই জনপদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৭৮৩ সালের ঐতিহাসিক রংপুর প্রজাবিদ্রোহের স্মৃতি। নবাব নূরুল উদ্দীন বাকের জং, রাজা শিবচন্দ্র রায়, দেবীচৌধুরানী,এলাকার চারপাশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সেই সময়ের প্রজাদের অধিকার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে যুক্ত হয়েছিলেন। হিন্দু-মুসলমান প্রজাদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ সেই ইতিহাসকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে।
অথচ সেই ইতিহাসের স্মৃতিবাহী রাজবাড়িই আজ ধ্বংসের পথে। অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে স্থাপনা, হারিয়ে যাচ্ছে স্মৃতি। তাই তরুণদের এই উদ্যোগকে শুধু একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে আছে ইতিহাসের প্রতি ভালোবাসা এবং নিজেদের শেকড়কে নতুন করে জানার আকাঙ্ক্ষা।
ইটাকুমারীর এই জমিদারবাড়িতে রয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ কাঠগোলাপ গাছ। বহু বছরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে গাছটি আজও দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতিপ্রেমী সাঈক সিরাজও ইটাকুমারীতে এসে এই কাঠগোলাপ নিয়ে ভিডিও করেছিলেন। ভাঙা রাজবাড়ির পাশে তার ফুল ফোটার দৃশ্য যেন বলে—ধ্বংসের মধ্যেও জীবন থেমে থাকে না।
তরুণদের এই উদ্যোগকে আরও অর্থবহ করা যায়। রাজবাড়ির পরিচ্ছন্নতা নিয়মিত রক্ষা করা, ঐতিহাসিক স্থাপনার অবশিষ্ট অংশ সংরক্ষণ করা, প্রজাবিদ্রোহের ইতিহাস নিয়ে ছোট তথ্যফলক স্থাপন করা এবং কাঠগোলাপসহ পুরোনো বৃক্ষগুলো রক্ষা করা—এসব কাজ তাঁদের চায়ের আড্ডাকে আরও বড় সামাজিক উদ্যোগে পরিণত করতে পারে।
সরকার, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও ইতিহাসসচেতন মানুষ যদি এই তরুণদের পাশে দাঁড়ান, তাহলে ইটাকুমারী আবারও মানুষের কাছে ফিরে আসতে পারে। এখানে গড়ে উঠতে পারে একটি ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র। তরুণদের চায়ের আড্ডা হতে পারে সেই নবজাগরণের প্রথম স্ফুলিঙ্গ।
সেদিন রাতে নানারঙের আলোয় সাজানো ইটাকুমারী দেখে মনে হলো, যে রাজবাড়ির চারপাশে একদিন আবর্জনা, আগাছা আর দুর্গন্ধে মানুষ দাঁড়াতে চাইত না, আজ সেখানে মানুষের ভিড়। চায়ের কাপ হাতে তরুণেরা গল্প করছে। হাসির শব্দে মুখর চারপাশ। আলোয় পুরোনো দেয়ালগুলো যেন নতুন করে নিজেদের ইতিহাস বলতে চাইছে।
একটি চায়ের দোকান দিয়ে জমিদারবাড়ি সংরক্ষণ করা যায় না। কিন্তু একটি চায়ের আড্ডা মানুষকে জমিদারবাড়ির কাছে ফিরিয়ে আনতে পারে। একটি পরিচ্ছন্নতা অভিযান দিয়ে ইতিহাস রক্ষা করা যায় না। কিন্তু সেই উদ্যোগ মানুষের মধ্যে ইতিহাস রক্ষার দায়বোধ তৈরি করতে পারে।ছোট উদ্যোগ থেকেই বড় পরিবর্তনের শুরু হয়।
ইটাকুমারীর তরুণেরা হয়তো সেই পরিবর্তনের দরজায় প্রথম কড়া নাড়ছেন।চায়ের কাপ ছোট। কিন্তু সেই কাপে কখনো কখনো একটি জনপদের জাগরণের স্বপ্নও দেখা যায়।টাকুমারীর সেই স্বপ্ন আজ তারুণ্যের হাতে।
আর সেই স্বপ্নের নাম—ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা, ইটাকুমারীকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা।